স্পর্শমাত্র ভাইরাস নিধন

স্পর্শমাত্র ভাইরাস নিধন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ মে, ২০২৬

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন এক অভিনব প্লাস্টিক ফিল্ম তৈরি করেছেন, যা কোনো রাসায়নিক ছাড়াই স্পর্শমাত্র ভাইরাসকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করতে পারে। নতুন এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে হাসপাতাল, গণপরিবহন, মোবাইল ফোন, খাবারের প্যাকেট কিংবা অন্যান্য বহুল ব্যবহৃত পৃষ্ঠতলকে অনেক বেশি নিরাপদ করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

গবেষকদের তৈরি এই ফিল্মটি অত্যন্ত পাতলা, নমনীয় এবং অ্যাক্রিলিক-ভিত্তিক উপাদানে নির্মিত। তবে এর আসল শক্তি লুকিয়ে আছে এর পৃষ্ঠতলে। সেখানে রয়েছে অগণিত অতি সূক্ষ্ম ন্যানো-স্তম্ভ। যেগুলোর আকার এতটাই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখা অসম্ভব। এই নকশার অনুপ্রেরণা এসেছে প্রকৃতি থেকে, বিশেষ করে কিছু পতঙ্গের ডানার গঠন থেকে, যেখানে ওই রকম ক্ষুদ্র কাঠামো জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে।

নতুন ফিল্মটির ওপর কোনো ভাইরাস এসে পড়লে, ন্যানো-স্তম্ভগুলো ভাইরাসের বাইরের আবরণকে আটকে ধরে টানতে শুরু করে। এর ফলে ভাইরাসের গঠন বিকৃত হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তার সুরক্ষা খোলস ছিঁড়ে যায়। একবার এই আবরণ নষ্ট হয়ে গেলে ভাইরাস আর সংক্রমণ ঘটাতে পারে না। অর্থাৎ, প্রচলিত জীবাণুনাশকের মতো এটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং নিখাদ যান্ত্রিক শক্তির সাহায্যে ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে।

গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানব প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস টাইপ-৩ (hPIV-3)-এর প্রায় ৯৪ শতাংশ এই ফিল্মের সংস্পর্শে আসার এক ঘণ্টার মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যায়। এই ভাইরাসটি ব্রঙ্কিওলাইটিস ও নিউমোনিয়া প্রভৃতি শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন জটিল রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, ন্যানো-স্তম্ভগুলোর বিন্যাস এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব স্তম্ভ মাত্র ৬০ ন্যানোমিটার দূরত্বে ঘনভাবে সাজানো, সেগুলো ভাইরাস ধ্বংসে সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত নকশা তৈরি করে এই প্রযুক্তির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে কোনো রাসায়নিক জীবাণুনাশক লাগে না। ফলে বারবার পরিষ্কার করার প্রয়োজন কমবে, পৃষ্ঠতলের ক্ষয় কম হবে এবং জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, যদিও সময়ের সঙ্গে অন্য সব উপাদানের মতো এই ফিল্মও ক্ষয় হবে, তবু এটি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে হাসপাতাল, বিমানবন্দর, বাস-ট্রেনের হাতল, দরজার হাতল কিংবা মোবাইল স্ক্রিনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার হলে ভাইরাস ছড়ানো অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে।

সূত্র: Elena Ivanova, The Conversation (published in Advanced Science).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − sixteen =