স্বপ্নের নেপথ্যে শক্তি

স্বপ্নের নেপথ্যে শক্তি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ আগষ্ট, ২০২৬

আমরা যখন ঘুমাই, সে সময় আমাদের শরীর বিশ্রামরত অবস্থায় থাকলেও মস্তিষ্ক কিন্তু কখনোই পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকে না। বিশেষ করে র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুম, অর্থাৎ যে পর্যায়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে, সেই সময় মস্তিষ্ক অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। জাপানের তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, REM ঘুমের সময় মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ এবং শক্তির কাঁচামাল বাড়লেও নিউরনের তাৎক্ষণিক শক্তির উৎস ATP (অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট)-এর মাত্রা বরং কমে যায়। এই গবেষণাটি বিস্তারিরভাবে প্রকাশিত হয়েছে কমিউনিকেশনস বায়োলজি জার্নালে।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ স্বচ্ছ আবরণ ব্যবহার করে ইঁদুরের করোটির ওপর থেকেই মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা একই সঙ্গে তিনটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন—মস্তিষ্কে রক্তের পরিমাণ, অ্যাস্ট্রোসাইট নামক সহায়ক কোষে পাইরুভেট-এর মাত্রা এবং নিউরনের ভেতরে ATP-এর পরিমাণ। অ্যাস্ট্রোসাইট রক্ত থেকে গ্লুকোজ গ্রহণ করে সেটিকে এমন উপাদানে রূপান্তর করে, যা নিউরন ATP তৈরিতে ব্যবহার করতে পারে। দেখা যায়, REM ঘুম শুরু হওয়ার প্রায় ৫০ সেকেন্ড আগে থেকেই মস্তিষ্কের কর্টেক্সে রক্তপ্রবাহ বাড়তে শুরু করে। এই বৃদ্ধি প্রথমে মস্তিষ্কের পেছনের অংশে দেখা যায় এবং ধীরে ধীরে সামনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ স্বপ্নের পর্যায়ে প্রবেশের আগেই মস্তিষ্ক বাড়তি শক্তির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করে।

REM ঘুম শুরু হলে অ্যাস্ট্রোসাইট কোষে পাইরুভেটের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এটা শক্তি উৎপাদনের কাঁচামাল বেশি পরিমাণে তৈরি বা জমা হওয়ার ইঙ্গিত। কিন্তু একই সময়ে নিউরনের ATP-এর মাত্রা কমে যায়। গবেষকদের ধারণা, স্বপ্ন দেখার সময় স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে জটিল যোগাযোগের কারণে নিউরন এত দ্রুত ATP ব্যবহার করে যে, উৎপাদনের গতি সেই চাহিদা পূরণ করতে পারে না। ফলে ATP-এর সাময়িক ঘাটতি দেখা দেয়।

আরও দেখা গেছে, যে শুধু রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলেই নিউরনের ব্যবহারযোগ্য শক্তি বাড়ে না। রক্ত থেকে শক্তির উপাদান সরবরাহ, অ্যাস্ট্রোসাইটের মাধ্যমে তার প্রক্রিয়াকরণ, নিউরনে স্থানান্তর এবং ATP উৎপাদন—এই প্রতিটি ধাপ আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই বেশি রক্ত বা বেশি জ্বালানি মানেই বেশি শক্তি নয়।

গবেষকদের বিশ্বাস, REM ঘুমে শক্তি ব্যবস্থাপনার এই সূক্ষ্ম পুনর্বিন্যাসই মানব মস্তিষ্ককে মাত্র ২০ ওয়াট শক্তি ব্যবহার করেও অসাধারণ দক্ষতায় চিন্তা, স্মৃতি, অনুভূতি ও অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। REM ঘুমে শক্তির এই পুনর্বিন্যাস বুঝলে ভবিষ্যতে স্মৃতি গঠন, স্বপ্নের ভূমিকা এবং ঘুম-সম্পর্কিত স্নায়বিক রোগ নিয়ে গবেষণার নতুন দিক উন্মোচিত হবে।

সূত্র: Why Dreaming Leaves the Brain Running Low on Energy, 1st August,2026, published in communications biology.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + nine =