প্রাণীজগতের একটা বহু প্রচলিত ধারণা হলো, পুরুষ প্রাণীরাই প্রজননের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি জিন ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু আফ্রিকার ডোরাকাটা হায়েনাদের ওপর পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এই ধারণায় কিছু নতুন সংযোজন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম প্রজন্মে পুরুষদের প্রজনন সাফল্য বেশি হলেও, কয়েক প্রজন্ম পর পুরো গোত্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে মাত্র কয়েকটি আলফা/দলনেত্রী স্ত্রী হায়েনার বংশধর। অর্থাৎ, প্রকৃত উত্তরাধিকার গড়ে ওঠে মাতৃসূত্রেই।
এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা তানজানিয়ার এনগোরোঙ্গোরো ক্রেটারের আটটি হায়েনা গোত্রকে টানা ২৯ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিটি হায়েনাকে তাদের শরীরের দাগ, কানের বিশেষ চিহ্ন এবং ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। পরে ২,৭৪৩টি হায়েনার আট প্রজন্মব্যাপী পারিবারিক বংশতালিকা তৈরি করে বিশ্লেষণ করা হয়। এত দীর্ঘ সময় ধরে একই প্রাণীর সংখ্যা অনুসরণ করার মতো গবেষণা বিশ্বে অত্যন্ত বিরল।
প্রথমে বিজ্ঞানীরা শুধু শাবকের সংখ্যা গণনা করেন। সেখানে দেখা যায়, কয়েকটি পুরুষ হায়না বিপুল সংখ্যক শাবকের জন্ম দিলেও অধিকাংশ পুরুষের কোনো সন্তানই হয় না। কিন্তু যখন শাবক এবং তারও পরের প্রজন্মের সংখ্যা গণনা করা হয়, তখন ছবিটা পুরোপুরি বদলে যায়। দেখা যায়, অল্পসংখ্যক স্ত্রী হায়নার বংশধররাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দ্রুত বৃদ্ধি পায়, আর প্রায় অর্ধেক স্ত্রী হায়েনা কোনো শাবক বা পরবর্তীতে সেই শাবকের বংশধর রেখে যেতে পারে না।
এই বৈষম্যের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে হায়নাদের সামাজিক কাঠামোতে। এই ডোরাকাটা হায়নাদের সমাজ সম্পূর্ণ মাতৃতান্ত্রিক। প্রতিটি গোত্রের নেতৃত্ব দেয় একজন আলফা স্ত্রী হায়েনা। তার সামাজিক মর্যাদা উত্তরাধিকার হিসেবে কন্যাসন্তানদের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। ফলে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মায়ের মেয়েরা জন্ম থেকেই উন্নত অবস্থান লাভ করে। তারা সহজে খাবার পায়, দ্রুত বেড়ে ওঠে, কম বয়সে প্রজনন শুরু করে, বেশি শাবক বড় করতে পারে এবং দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। অন্যদিকে পুরুষ হায়েনারা প্রজননের আগে নিজ গোত্র ছেড়ে অন্য দলে চলে যায় এবং সেখানে একেবারে নীচের তলা থেকে নতুন জীবন শুরু করতে বাধ্য হয়। ফলে মায়ের সামাজিক সুবিধা তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
গবেষকেরা এক হাজারেরও বেশি কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশনের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেন, সামাজিক মর্যাদা উত্তরাধিকার হিসেবে স্থানান্তরিত না হলে কী ঘটত। দেখা যায়, শুধু বেশি সন্তান জন্ম দিলেই কোনো মাতৃবংশ বাস্তবের মতো দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে না। অর্থাৎ, সামাজিক ক্ষমতার উত্তরাধিকারই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি পরিবারের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রধান চালিকাশক্তি।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার হায়েনার সামাজিক জীবনের পাশাপাশি অন্যান্য মাতৃতান্ত্রিক প্রাণীর বিবর্তনও নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করেছে। যেখানে সামাজিক মর্যাদা উত্তরাধিকারের মাধ্যম হল মা, সেখানে কয়েকটি শক্তিশালী মাতৃবংশ ধীরে ধীরে পুরো গোত্রের একটা বড় অংশের পূর্বজতে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: The legacy of privilege: Social inheritance reverses sex differences in reproductive inequality in the spotted hyena by Marta Mosna , Alexandre Courtiol , Philemon Naman,et.al; published in Science Advances,23 Jul 2026,Vol 12, Issue 30, DOI: 10.1126/sciadv.aee7880
