প্রকৃতির প্রবল শক্তির সামনে টিকে থেকে তথ্য সংগ্রহের এক অসাধারণ নজির গড়লো গবেষণালব্ধ চালকবিহীন নৌযান। ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর মেক্সিকো উপসাগরে তৃতীয় শ্রেণির হারিকেন Isaias-এর কেন্দ্রস্থলকে সরাসরি অতিক্রম করে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এল ‘সেলড্রোন এক্সপ্লোরার SD-1045’। ঘণ্টায় ১৬৬ কিলোমিটার বেগের ঝোড়ো হাওয়া এবং প্রায় ২০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মধ্যেও নৌযানটি তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। হারিকেনের মতো বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই অভিযান এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রায় ৬৮০ কিলোগ্রাম ওজনের ২৩ ফুট লম্বা এই স্বয়ংক্রিয় গবেষণা-নৌযানটি অভিযান চলাকালে ফ্লোরিডার পেনসাকোলা উপকূল থেকে প্রায় ১৫০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে অবস্থান করছিল। নৌযানটির পরিচালকেরা ক্যালিফোর্নিয়ার আলামেডা থেকে দূরনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর গতিবিধি পরিচালনা করেন। হারিকেনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে প্রবেশের সময় নৌযানটি ঘণ্টায় ১০৩ মাইলেরও বেশি বেগের ঝোড়ো হাওয়া এবং প্রায় ৬৫ ফুট উঁচু ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নৌযানটি হারিকেনের কেন্দ্রস্থল অতিক্রম করে নিরবচ্ছিন্নভাবে বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাতে থাকে।
সেলড্রোন এক্সপ্লোরারের বিশেষত্ব হল, এটি চলার জন্য বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে। অন্যদিকে, সৌর প্যানেলের সাহায্যে পরিচালিত হয় এর বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। নৌযানটিতে থাকা বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে বাতাসের গতি, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা, সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা এবং ঢেউয়ের উচ্চতা ও পরিস্থিতি পরিমাপ করা হয়। এই তথ্যগুলি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, কীভাবে হারিকেনের সৃষ্টি হয়, কীভাবে তার শক্তি বাড়ে এবং সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক ক্রিয়া কীভাবে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে।
এই অভিযানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (NOAA) এবং সেলড্রোনের যৌথ উদ্যোগের অংশ। এর মূল লক্ষ্য, হারিকেনের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করে তোলা। বর্তমানে উপগ্রহ ও বিমান থেকে ঘূর্ণিঝড়ের নানা তথ্য সংগ্রহ করা হলেও সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি পরিবেশের ধারাবাহিক পরিমাপ পাওয়া কঠিন। সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে এই ধরনের চালকবিহীন নৌযান।
হারিকেনের মতো বিপজ্জনক পরিবেশেও দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা ভবিষ্যতে আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে আরও উন্নত করতে পারে। বিশেষত, কোন পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড় দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তা আগেভাগে শনাক্ত করা গেলে উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষকে সময়মতো সতর্ক করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে। তাই এই অভিযান শুধু একটা প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, বরং ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
সূত্র: NOAA/AOML, Autonomous Ocean Monitoring Platform.
