রোমান সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেছিল তার সেনাবাহিনী। কিন্তু সেই বিশাল ভূখণ্ডকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে একসূত্রে বেঁধেছিল মুদ্রা, বাজার, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৪০ লক্ষ প্রাচীন রোমান মুদ্রায় মুদ্রিত গতিপথ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, কীভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫ থেকে খ্রিস্টীয় ২ শতকের মধ্যে রোমের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ক্রমশ বিস্তৃত ও সংযুক্ত হয়ে উঠেছিল।
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এদুয়ার্দো আমরাল হাদ্দাদ ও ইনাসিও ফার্নান্দেস আরাউহোর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে হিউম্যানিটিস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স কমিউনিকেশন্স পত্রিকায়। গবেষকেরা প্রায় ২৪,৬৪৬টি মুদ্রাভাণ্ডার থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ মুদ্রার তথ্য সংগ্রহ করেন। এতে মুদ্রাগুলির কোথায় তৈরি হয়েছিল এবং প্রায় ২,০০০ বছর পরে কোথায় পাওয়া গিয়েছিল—এই দুই তথ্যকে একত্র করে তৈরি করা হয় ৫,১৬৭টি সংযোগের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। গবেষণায় ব্যবহার করা হয় সি এইচ আর আর, স্ট্যানফোর্ডের ORBIS, Pleiades gazetteer এবং Roman Road Network-এর মতো ডিজিটাল প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক তথ্যভান্ডার।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুদ্রাগুলি এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। বরং প্রধান সড়ক, বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রকে অনুসরণ করেই তাদের বিস্তার ঘটেছিল। অর্থাৎ রোমের রাস্তা ও পরিবহণব্যবস্থা শুধু সৈন্য ও রসদ বহন করেনি, বহন করেছে অর্থ, পণ্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও। প্রথমদিকে রোমান সেনাবাহিনী নতুন দখল করা অঞ্চলে মুদ্রা পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল। সৈন্যদের বেতন, সেনাবাহিনীর সরবরাহ এবং তাদের সঙ্গে আসা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সেখানে মুদ্রার চাহিদা তৈরি হয়।
তবে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হল—সেনাবাহিনী মুদ্রার প্রচলন শুরু করলেও তা স্থায়ী করেনি। নতুন অঞ্চলগুলিতে বাজার, শহর, প্রশাসনিক কাঠামো, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার পরই মুদ্রার ব্যবহার স্থায়ী রূপ পায়। অর্থাৎ সামরিক বিজয় ছিল সূচনা, কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানই তৈরি করেছিল দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, রোমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা তার উৎপাদনস্থল থেকে ক্রমশ দূরে যেতে শুরু করে। অর্থাৎ ভৌগোলিক দূরত্বের প্রভাব কমতে থাকে এবং বিভিন্ন অঞ্চল একটাই পরিবহণ, বাজার ও আর্থিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়। রোম ছিল প্রশাসনিক ব্যয়ের কেন্দ্র; ইতালি ছিল ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র। নতুন দখল করা অঞ্চলে প্রথমে সামরিক ব্যয় প্রাধান্য পেলেও ধীরে ধীরে সেখানে প্রশাসন, বাণিজ্য ও নাগরিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্ব পায়।
তাই প্রাচীন রোমের ইতিহাসকে শুধু যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনি হিসেবে নয়, একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ইতিহাস হিসেবেও দেখা যেতে পারে। সাম্রাজ্য জয় করা যায় অস্ত্র দিয়ে, কিন্তু তাকে দীর্ঘদিন ধরে একত্রে রাখতে প্রয়োজন হয় বাজার, প্রতিষ্ঠান ও অর্থের অবিরাম প্রবাহ।
সূত্র: https://scitechdaily.com/four-million-ancient-coins-reveal-what-really-held-the-roman-empire-together/
