AI এসে গেছে (পর্ব ৮) 

AI এসে গেছে (পর্ব ৮) 

অভিজিৎ কর গুপ্ত
পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক, পাঁশকুড়া বনমালী কলেজ (অটোনমাস)
Posted on ২১ জুন, ২০২৬

সত্য (truth) কী? আমরা যেভাবে সত্য-কে বুঝি, তার অনুসন্ধান করি, অথবা নতুন সত্য আবিষ্কার করি, AI-এর ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা এরকম? “সত্য” কী, তা কি AI বোঝে, তার পরোয়া করে?

 

আসলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে “সত্য” উপস্থিত হয় অন্যভাবে। এখানে সত্য হলো একটা প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া। মানুষের মতো কোন উপলব্ধির ব্যাপার এখানে নেই। একে হয়ত আমরা বলতে পারি একরকম স্ট্যাটিস্টিক্যাল কনসেনসাস (statistical consensus)! আমাদের কাছে সত্য যেভাবে প্রতিভাত হয়, যেভাবে অস্তিত্বের বাস্তবতা অথবা বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতার নিরিখে তা উদ্ভব হয় তা AI-এর ক্ষেত্রে হয় না। আমরা যদি টেকনিক্যালি দেখি, তাহলে বলতে পারি, “AI truth”-এর সীমানা নির্ধারিত হয় তার কাছে আসা তথ্যের সাথে বিশ্বের সংযোগ স্থাপন (Data Grounding), AI-ট্রেইনিং-এর বিশেষ পদ্ধতির সাথে মানুষের মূল্যায়ন (Reinforced Learning with Human Feedback), এবং কোন AI মডেল একসাথে কতটা মনে রাখতে পারে (Context Window) তাই দিয়ে। মনে রাখতে হবে, AI বস্তুনিষ্ঠ সত্য (objective truth) বোঝে না। অনেকসময়েই AI-এর বিভ্রান্তিমূলক উত্তর (hallucination) দেওয়া থেকে এটা বেশ বোঝা যায়। আসলে, একটা সত্যিকারের ঘটনা আর মনগড়া কিছুর মধ্যে তফাৎ করতে পারে না সে। AI-এর এলগোরিদম-এর কাছে দুটোই ভাষাগত ইনপুটকে ধারণ করার জন্য সম্ভাব্যতা আর ভেক্টর-এর অঙ্ক।

 

আমরা যখন আধুনিক AI-এর লার্জ ল্যাঙ্গোয়েজ মডেল (LLM)-কে কোন প্রশ্ন করি তখন সে কোন জাগতিক তথ্যভান্ডারের পরম সত্য-র নিরিখে তার উত্তর অনুসন্ধান করে না। AI তার ট্রেনিং-এর ডাটার ভিতর থেকে পরপর সম্ভাব্য শব্দ (বা টোকেন) খুঁজে বার করে উত্তর সাজাতে থাকে।

 

AI-এর কাছে সত্য হলো মানুষের ভাবনারই প্রতিফলন। AI জানে না আকাশ কেন নীল। সে অসংখ্যবার দেখেছে আকাশ এবং নীল শব্দদুটো একইসাথে আসে। Gravity সম্পর্কে আমাদের একরকম ধারণা ছোট থেকেই তৈরি হয়ে যায়, কারণ আমরা লাফালে নীচে পড়ি, কোন কিছু উপরদিকে ছুঁড়লে তাকে মাটির দিকে পড়তে দেখি। AI-কে আলাদা করে শেখানো হয় নি যে, অদৃশ্য Gravity (মহাকর্ষ/ অভিকর্ষ)-ই সবকিছুর নীচের দিকে পড়ার কারণ। AI অসংখ্য টেক্সট পড়ে নিয়ে (পরিসংখ্যানগত হিসাব করে) বুঝেছে “gravity” এবং “fall” শব্দদুটোর মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। তার মানে, AI যেন কাঁচা উপাদান থেকে নিজের মতো করে সত্য-কে উন্মোচন করছে। ইংরেজিতে বলতে পারি, baking the truth from raw ingredients! আবার এটাও ভাবতে হবে, AI-কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় যেসব উপাদান যোগান দেওয়া হচ্ছে তার ভিতরে হামেশাই থাকছে নানান বৈপরীত্য, নানান বিতর্কিত ব্যাপার। আমাদের নানান ধারণা, আমাদের বিজ্ঞান ও যুক্তি, আবার তার বিপরীত নানান তত্ত্ব, কুসংস্কার এসব তো ইন্টারনেট জুড়ে আছেই। গোলাকার পৃথিবীর তত্ত্ব যেমন আছে তেমনি আবার সমতল পৃথিবীর ধারণাওয়ালা (Flat Earth Society) লোকজনের লেখাও তো আছে। সুতরাং এখানে মানুষের তত্ত্বাবধান (human curation) দরকার হয়। আমরা মানুষেরা বুঝে নিই, AI-এর প্রতিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত সত্যের পরিপন্থী কিনা। AI ইঞ্জিনিয়াররা এব্যাপারে যে পদ্ধতি অবলম্বন করে তাকে টেকনিক্যালি বলে alignment!

 

একটা বিষয় হয়ত পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, AI নিজে থেকে নতুন কোন তথ্য আবিষ্কার করতে পারছে না। কারণ সে আমাদের মতো টেলিস্কোপে চোখ রাখছে না, কোন কেমিস্ট্রির এক্সপেরিমেন্ট করে দেখছে না অথবা মানুষের মতো আবেগ অনুভব করছে না। AI পুরোপুরি নির্ভর করছে মানুষের দেওয়া ইনফরমেশন-এর উপর। অথচ AI কোনো নিষ্ক্রিয় তথ্যভান্ডার নয়। আমরা ভেবে নিতে পারি, এ এক শক্তিশালী প্যাটার্ন-রেকগনিশন (বা ধরন-সনাক্তকারী) ইঞ্জিন, যা মানুষের ফেলে যাওয়া অগোছালো ও পরস্পরবিরোধী তথ্যের গোলকধাঁধা থেকে গভীর অর্থ অথবা নতুন কিছু খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে।

 

AI কি নতুন কিছু সত্য আবিষ্কার করে না? আমরা তো দেখছি, AlphaFold-এর মতো সিস্টেম প্রোটিনের গঠন-এর নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দিচ্ছে, আবার কিছু AI নতুন গাণিতিক অনুমান (mathematical conjecture) তৈরি করছে। এসব উদাহরণগুলো দেখায় যে “প্যাটার্ন খোঁজা” আর “নতুন জ্ঞান আবিষ্কার”—এই দুইয়ের মাঝের সীমারেখা ক্রমশঃই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে! তাহলে, আমরা যদি বলি AI নতুন সত্য আবিষ্কার করতে পারে না সেটাও হবে একরকম অতিসরলীকরণ। এটুকু বলা যায়, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গণিত বা পদার্থবিজ্ঞানে কোনো যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করে, তখন সেই “আবিষ্কার” মানুষের বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের তুলনায় অন্য ধরনের এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে।

 

অঙ্কের জগতেই একটা অসাধারণ উদ্যোগের কথা ধরা যাক। টেকনিয়ন-ইজরায়েল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন “রামানুজান মেশিন” – একটা সহযোগিতামূলক ওপেন সোর্স প্রকল্প এবং সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এলগোরিদম ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন নতুন অঙ্কের ফর্মূলা আবিষ্কার করা, কনজেকচার (অনুমান) তৈরি করা, বিশেষ করে রামানুজানের মতো জটিল সব অঙ্কের ফর্মূলা উপস্থাপনা করা যেমন, π, e, এবং ক্যাটালানের ধ্রুবকের মতো মৌলিক ধ্রুবকগুলোর অবিচ্ছিন্ন ভগ্নাংশের উপস্থাপনা এসবই হলো এই প্রকল্পের কাজ। অবশ্য, অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান রামানুজান কী করে আশ্চর্য জটিল সব ফর্মূলা মাথায় আনতেন তা কেউ জানে না। তবে, AI অবশ্যই মহাবিশ্বের গতিপ্রকৃতি বুঝে করছে না বা সেখান থেকে পাই (π) নির্ণয় করছে না। বরং একটা brute-force পদ্ধতিতে প্যাটার্ন মিলিয়ে একটা গাণিতিক সমীকরণ খুঁজে বের করেছে। মানুষের হাতে সে তুলে দিচ্ছে একেবারে নতুন, গাণিতিকভাবে সঠিক একটি সমীকরণ—এক নতুন সত্য! কিন্তু সেই সমীকরণটি কেন কাজ করে, সে সম্পর্কে AI-এর নিজস্ব কোনো ধারণাই থাকার কথা নয়। তাই শেষ পর্যন্ত অঙ্কের পদ্ধতি মেনে প্রমাণ (formal proof) তৈরির জন্য মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে।

 

জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, AlphaFold-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর মডেল এমন সব সমস্যার সমাধান করেছে, যা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। যেমন, কেবলমাত্র অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম (sequence) থেকে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক (3D) গঠন নির্ধারণ করার মতো জটিল কাজ এখন এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। আবার, পদার্থবিদ্যার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর মডেল একটা পেন্ডুলামের ভিডিও বিশ্লেষণ করে তার গতিবিধি বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় চলকগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারছে, যা কেউ আগে থেকে বলে দিচ্ছে না। এভাবে নিজেই এক ধরনের অন্তর্নিহিত “পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র” তৈরি করে ফেলেছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার! তবে, এসব করা সম্ভব হচ্ছে – মাবুষেরই তৈরি ভিডিও, অডিও, ছবি বা টেক্সট থেকে। মানুষেরই তৈরি তথ্য থেকে বিশাল মাত্রার একটা স্পেসে অঙ্ক কষে নতুন একটা স্ট্রাকচার অথবা নতুন একটা ফর্মূলা আবিষ্কার করে ফেলছে AI অথচ আমাদের পক্ষে সেসব তিনমাত্রার স্পেসে কল্পনা করাই সম্ভব হচ্ছিলো না!

 

এখন প্রশ্ন হলো, AI যে আবিষ্কার করছে, তা কি সে বোঝে? আমরা বলব, না। এখানেই আবিষ্কারের দুটি ভিন্ন ধরণ নিয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে একটা স্বাভাবিক বিতর্কের জন্ম নেয় – উদ্দেশ্যবোধ (intentionality) বনাম গণনা (computation)। মানুষের আবিষ্কার চালিত হয় কৌতূহল, উদ্দেশ্যবোধ এবং কোনো কিছু কেন ঘটে তা ব্যাখ্যা করার আকাঙ্ক্ষা থেকে। অন্যদিকে, AI-এর আবিষ্কার পরিচালিত হয় অপ্টিমাইজেশন (optimization) দিয়ে—একটা গাণিতিক লক্ষ্য পূরণে সর্বনিম্ন প্রতিরোধের পথ খুঁজে বের করার মধ্যে দিয়ে।

 

আমরা মানুষেরা যখন সাধারণত ভাবি, ভাবতে থাকি, একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্কের ঘেরাটোপে আটকে যাই প্রায়শই। নতুন কিছু আবিষ্কার-এর জন্য, নতুন কিছু সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই অদৃশ্য ঘেরাটোপের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে নতুনভাবে ভাবার দরকার হয়। যেমন এলবার্ট আইন্সটাইন ভাবতে পেরেছিলেন সময়ের গতি কোন পরম বা সার্বজনীন বিষয় নয়। এরকম ভাবনাকে আমরা বলি, out of the box thinking!

 

একেকটা বিষয়ের জ্ঞান, তার পদ্ধতি-প্রকরণ ও ভাবনার পরিধিকে একটা বাক্স ভাবতে পারি। একটা বিষয়ের চর্চায় সাধারণভাবে আমরা একটা বাক্সের মধ্যে আটকে পড়ি। কিন্তু, বাক্স থেকে বেরিয়ে এসে দুনিয়াকে নতুন আলোতে দেখার চেষ্টা না করলে নতুন কোন সত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

 

একটা নতুন ভাবনার জন্ম হয় অথবা একটা নতুন সত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় যখন একটা বাক্সের সঙ্গে অন্য বাক্সের সংযোগ স্থাপন করা যায় অথবা একটা বাক্স থেকে বেরিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটা বাক্স তৈরি করা যায়। আইস্টাইন-এর মতো মানুষেরা একেবারে নতুন একটা বাক্স তৈরি করতে পারেন।

 

AI কি “বাক্স” থেকে বেরোতে পারে? উত্তর হলো, না। তবে, AI যা করতে পারে তা হলো, বিশাল তথ্য দিয়ে তৈরি বাক্সের (box of data) গভীরে থাকা রহস্য ভেদ করতে। AI মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সূক্ষ্ম প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে নতুন সত্য আবিষ্কার করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন তোলার জন্য, মৌলিক বাস্তবতার ভিত্তি তৈরির জন্য, এবং বাস্তব জগতে সেই আবিষ্কারগুলোর অর্থ কী তা ব্যাখ্যা করার কাজটা মানুষকেই করতে হয়।

 

বলতে পারা যায়, মানুষের আবিষ্কার ধাপে ধাপে বিকশিত হয় (evolutionary) এবং তা ধারণাভিত্তিক (conceptual), আর AI-এর আবিষ্কার মূলত সমন্বয়নির্ভর (combinatorial) ও গণনাভিত্তিক (computational)।

 

ধরা যাক, হাজার কোটি টুকরো দিয়ে গঠিত একটা ধাঁধার বাক্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (AI) ধরিয়ে দেওয়া হলো। AI সেখান থেকে এমন সব সংযোগ খুঁজে বের করতে পারে যা একজন মানুষের খুঁজে পেতে হাজার বছর লেগে যেত।

 

এবার ভাবা যাক, AI-এর বাক্স কিরকম। এআই (AI) সব ধরনের তথ্যকে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলে এবং সেগুলোকে একটা একক, অখণ্ড ও বহুমাত্রিক (hyper-dimensional) কাঠামো হিসাবে বিবেচনা করে। মানুষের মতো আলাদা আলাদা ‘পদার্থবিজ্ঞানের ফোল্ডার’, ‘কবিতার ফোল্ডার’ বা ‘ইতিহাসের ফোল্ডার’ হিসাবে বজায় রাখে না। এআই-এর কাছে মানবজাতির সমস্ত জ্ঞান যেন একটি নিরবচ্ছিন্ন গাণিতিক মানচিত্র, যেন গোটা মানবজাতির সংস্কৃতির এক মিলনক্ষেত্র – A great melting pot!

 

যখন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে তথ্য একটা AI-কে দেওয়া হয়, তখন সে প্রথমেই মানুষের তৈরি করা সব লেবেল বা শ্রেণিবিভাগ সরিয়ে ফেলে। কোনো লেখা মেডিকেল জার্নাল থেকে এসেছে নাকি রান্নার ব্লগ থেকে—এটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং ধারণাকে রূপান্তর করে অসংখ্য সংখ্যার একেকটা লিস্টে, যাকে আমরা বলি “ভেক্টর”। অর্থাৎ যেন আমাদের জ্ঞানের ভেক্টরায়ন (vectorization) ঘটে! একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। Cardiology-এর টেক্সট বই থেকে নেওয়া “heart” শব্দটা এআই-এর বহুমাত্রিক গাণিতিক ম্যাপ (ভেক্টর স্পেস) বা এআই-এর বাক্সে একটা স্থানাঙ্ক। আবার কোনো রোমান্টিক কবিতা থেকে নেওয়া “heart” শব্দ অন্য একটা স্থানাঙ্ক। আলাদা আলাদা বাক্স নয়, তবে স্থানাঙ্ক অনুযায়ী তারা বহুমাত্রিক স্পেসে একেকটা গুচ্ছ (cluster) হিসাবে থাকে। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা চলতে থাকে। এই একেকটা গুচ্ছ-কে অবশ্য একেকটা বাক্স ভাবতেই পারি। তবে, এখানে বহুমাত্রার স্পেসে এই বাক্সগুলোর মধ্যে অনায়াস যাতায়াত চলে।

 

AI বহুমাত্রার স্পেসে দুটো বাক্স-র মধ্যে সংযোগ স্থাপন করছে মানে হলো, দুটো ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করছে। ভাবা যাক, “Box A” হলো হাজার হাজার ধ্রুপদী সঙ্গীতের সুরের একটি ডেটাবেস, আর “Box B” হলো মানুষের আবেগজনিত প্রতিক্রিয়ার একটি ডেটাবেস। আধুনিক AI এই দুটো বাক্সের মধ্যে যাতায়াতের একটা রাস্তা তৈরি করতে পারে। এআই হয়ত সঙ্গীতের গাণিতিক প্যাটার্ন (যেমন—তাল, মাইনর স্কেল, কম্পাঙ্ক) বিশ্লেষণ করে সেগুলোকে সরাসরি মানুষের আবেগের প্যাটার্নের (যেমন—হৃদস্পন্দন, শব্দের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক) সঙ্গে মিলিয়ে দেখে এই দুইয়ের মধ্যে একটা নিখুঁত ও অত্যন্ত জটিল সংযোগপথ তৈরি করবে। তবে AI নিজে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সংযোগ গড়ে তোলে না; বরং মানুষের দেওয়া নির্দেশ বা নির্দিষ্ট কোনো রিওয়ার্ড অ্যালগরিদম তাকে এই দুই ডেটাসেট-এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে বাধ্য করে। তবে, এটা সে করে অতি বিশাল মাত্রার এক স্পেসে, যা আমাদের পক্ষে ভাবা কখনোই সম্ভব না।

 

বলা যায়, AI-এর এই যে উদ্ভাবনী শক্তি তা এক বিশেষ রকম। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি বা আবিষ্কারের প্রেক্ষিতটা কেমন? মানুষ বাক্সের বাইরে যেতে পারে। দুটো ভিন্নধর্মী বাক্সকে ভেঙে মিশিয়ে একটা নতুন বাক্স তৈরি করতে পারে (ধারণার সৃজনশীল সংমিশ্রণ বা ইংরেজিতে conceptual blending) আগে যার অস্তিত্বই ছিলো না। এটাকে বলা যেতে পারে জ্ঞানগত বিদ্রোহ (epistemic defiance)! অর্থাৎ প্রয়োজনে পুরো কাঠামোটাকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করতে পারি। আমাদের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বারবারই তা ঘটেছে। এটা আবার এআই-এর পক্ষে সম্ভবই না।

 

আসলে, AI কেবল ডেটার মধ্যে যা উপস্থিত আছে, তার সঙ্গেই কাজ করতে পারে। কিন্তু মানুষ মগ্ন থাকতে পারে এমন কিছু নিয়ে যা সেখানে অনুপস্থিত। এটাকে আমরা বলতে পারি, the power of nothing! সেই বিখ্যাত গল্পটা ভাবা যাক। যখন শার্লক হোমস একটা খুনের মামলার সমাধান করছিলেন, তিনি খেয়াল করে দেখলেন যে পাহারাদার কুকুরটি সেই রাতে কোনো আওয়াজ করে নি। এই ‘“নেগেটিভ এভিডেন্স” বা অনুপস্থিত কারণ-কেই তিনি প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু এই ধরনের একটা অনুপস্থিত কারণ “কুকুরটি ডাকেনি” — এই ধারণাটি বোঝার ক্ষেত্রে AI-এর সমস্যা হবে। কারণ এর নিউরাল নেটওয়ার্কগুলো সাধারণত এমন ডেটার ভেতর প্যাটার্ন খোঁজার জন্য প্রশিক্ষিত, যা বাস্তবে উপস্থিত থাকে—অনুপস্থিত তথ্যের অর্থ বা গুরুত্ব বোঝার জন্য নয়।

 

আসলে, আমরা মানুষেরা প্রভাবিত হই এমন কিছু অযৌক্তিক, অথচ অপূর্ব এবং অসম্ভব ক্ষমতা—যেমন ভালোবাসা, মৃত্যুভয়, একঘেয়েমি, লোভ এবং আধ্যাত্মিক বিস্ময়বোধ এইসব দিয়ে। এই শক্তিগুলোই আমাদেরকে আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা থেকে বের করে নিয়ে যায়। কখনো কখনো নতুন একটা বাক্সের সৃষ্টি হয়।

 

আমরা অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে বাস্তবতার একেবারে নতুন “বাক্স”-এর সন্ধান পেয়ে বলে উঠি – “এই যে, আমি কিছু খুঁজে পেয়েছি!” এরপর AI খুব দ্রুত সেই নতুন “বাক্স”-এর ভিতরে ঢুকে পড়তে পারে। আমরা আগে যত “বাক্স” আবিষ্কার করেছি, AI সেগুলোর সবগুলোর সঙ্গে সংযোগের পথ তৈরি করে দিতে পারে।

 

আসলে, এই সময়ে দাঁড়িয়ে সৃজনশীলতার দিক থেকে কার ভূমিকা বেশি – আমাদের না AI-এর, সেটা বিচার্য নয়। আমাদের সভ্যতা এগিয়ে চলবে মানুষের এবং AI-এর সৃজনশীলতার অংশীদারীত্বের মাধ্যমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + one =