AI এসে গেছে ২ 

AI এসে গেছে ২ 

অভিজিৎ কর গুপ্ত
পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক, পাশকুড়া বনমালী কলেজ
Posted on ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

“Can Machine think?” মেশিন কি চিন্তা করতে পারে? ১৯৫০ সালে এই প্রশ্নটা রেখেছিলেন এলান টিউরিং তাঁর এক গবেষণা পত্রে বিখ্যাত ইমিটেশান গেম (Imitation game)-এর আইডিয়া দিয়ে। একটা মেশিন যদি এমনভাবে কথোপকথন চালাতে পারে যা থেকে মানুষ বুঝতে পারবে না যে তা মেশিন বলছে না মানুষ বলছে, তাহলে সেক্ষেত্রে মেশিন চিন্তা করছে কি করছে না এই বিষয়টা গুরুত্বহীন হয়ে যাবে।

 

বলা বাহুল্য, এখনকার AI টিউরিং-এর এই টেস্ট কবেই উৎরে গেছে। chatGPT 4 বা আরো অন্য সব AI কিন্তু নানা দিক থেকে করা নানারকম পরীক্ষামূলক টিউরিং টেস্ট অনায়াসেই পাশ করেছে।

 

আমাদের ভাবনা, আমাদের যাবতীয় জ্ঞানভান্ডার আর তা প্রকাশ করার ক্ষমতা অথবা অন্য কাউকে বোঝার চেষ্টা করা – এসবের বেশিরভাগটাই ভাষা কেন্দ্রিক। Large Language Model (LLM) বা বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহার করে AI এখন অত্যন্ত মার্জিত, পরিশীলিত এবং যুক্তিপূর্ণ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। আমরা অবাক হচ্ছি প্রতিনিয়ত, মুগ্ধ হচ্ছি। তাহলে AI-এর এই ভাষার ব্যবহার আর ভাষাতত্ত্বের উপর তার দক্ষতা বোঝার পরও কি আমরা এই প্রশ্নে আটকে থাকব যে সে আসলে মানুষের মতই মন থেকে কিছু বলছে নাকি অঙ্কের ক্যালকুলেশান করে বলছে? প্রশ্ন হলো, এতে কি কিছু এসে যাবে? তাহলে, হয়ত আরো গভীর প্রশ্ন আসবে, ‘মন’ আসলে কী? হয়ত উত্তর আসবে, তার উৎস হলো মানুষের ভিতরকার নিজস্ব কিছু ব্যাপার, জীববিজ্ঞানের রাস্তা ধরে তাকে আন্দাজ করা যাবে। কিন্তু, তারপরও আমরা প্রশ্ন করতে পারি, তাহলে ‘মন’ই কি সবকিছু বোঝা বা প্রকাশ করার একমাত্র রাস্তা? অন্য কোনভাবে কি একই জায়গায় পৌঁছানো যাবে না? এটা একটা দার্শনিক প্রশ্ন হতে পারে। বিষয়টাকে অনেকসময় রূপক হিসাবে stochastic parrot বা Chinese room problem হিসাবে ভাবেন অনেকে। Stochastic হলো সম্ভাব্যতার ব্যাপার। মানে, একটি তোতা, সে আমাদের শেখানো ভাষার প্যাটার্ন বুঝে নিয়ে সম্ভাব্যতার সূত্র অনুযায়ী পরপর একেকটি শব্দ বলে যাচ্ছে অথচ আমরা বুঝতেই পারছি না সে ভেবে বলছে কিনা। চাইনীজ রুমের পরীক্ষার কথা ভাবা যাক। একটি লোক যে চীনা ভাষা জানে না কিন্তু একটা বন্ধ ঘরে বিশাল এক চাইনীজ রুল বুক নিয়ে বসে আছে। এখন তাকে দরজার ফাঁক গলিয়ে কিছু চাইনীজ ক্যারেক্টার পাঠানো হচ্ছে আর সে রুলবুক পরামর্শ করে একেবারে সঠিক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। দরজার বাইরে থেকে যে কেউ ভাবতে পারে, লোকটি নিশ্চয়ই চাইনীজ জানে, অথচ সে কিছুই জানে না! আধুনিক AI অনেকটা এভাবেই কাজ করে। অসংখ্য মাত্রার অঙ্ক ব্যবহার করে যে প্রতিক্রিয়া সে দেখাচ্ছে বা যে উত্তর সে দিচ্ছে তা ভীষণভাবে মানুষেরই মতো। অথচ শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে মানুষের মতো তার কোন নিজস্ব অনুভূতি নেই, পুরোটাই probabilistic বা সম্ভাব্যতার ব্যাপার।

 

কিন্তু, তবু প্রশ্ন হচ্ছে, Can AI think? এই প্রশ্নটা আমাদের AI কে বোঝার জন্য জরুরি। আগেই বলেছি, AI এর থিংকিং হলো গাণিতিক। আমরা মানুষেরা যেভাবে চিন্তা করি অবশ্যই AI সেভাবে করে না। কিন্তু, যদি বলি কে কিভাবে চিন্তা করছে, তার চিন্তার পদ্ধতিটা কী আমাদের মতোই বায়োলজিক্যাল হতে হবে কিনা সেই বিষয়টা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? খুব স্থূল একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা সাবমেরিন সমুদ্রের গভীর জলে চলেছে। কিন্তু, তা মাছের মতোই সাঁতার কেটে চলেছে কিনা তা দিয়ে কী কিছু এসে যায়?

 

এখান থেকে আরো নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন আমাদের ভাবাতে পারে। চিন্তা করতে গেলে কি আমাদের মতো মস্তিষ্কই দরকার (বায়োলজিক্যাল ব্রেইন) নাকি অন্যরকম কিছু হতে পারে? অথবা ভাবা যাক, কোন জটিল এলগরিদম বা সফটওয়্যার-এর মাধ্যমে কি কোনদিন চেতনা বা অনুভব কে ছোঁয়া যেতে পারে?

 

আসলে, AI হয়ত সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী functionalism (কার্যকারিতা)-এর দিকে আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা হলো, একটা সিস্টেম যদি ভাবনা বা thinking-এর কাজটা করতে পারে, তাহলে সে কীভাবে ভাবছে তা আমাদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটা মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটার আর একটা ডিজিটাল ক্যালকুলেটার দুটোই আমাদেরকে বলে দিচ্ছে, 2 + 2 = 4 হবে। এটাই তো আসল সত্যি! তারা কীভাবে এই সিদ্ধান্তে এলো, সেই মেকানিজমটা কি এখানে গুরুত্বপূর্ণ? আসল ভাবনাটা তো একই দাঁড়ালো।

 

আসলে, আমরা মানুষেরা এই জগৎ-কে একটা ত্রিমাত্রিক বিষয় হিসাবে দেখি। তার বেশি আমরা ধারণায় আনতে পারি না। একটা চারমাত্রার কিউব (টেসার‍্যাক্ট) কে ধারণাতে আনতেই আমাদের কত স্ট্রাগল করতে হয়। তাহলে, AI যেমন হাজার হাজার মাত্রায় কল্পনা করে (আসলে, অঙ্ক করে), প্যাটার্ন খুঁজে বার করে তার পুরোটা আমাদের পক্ষে বোঝা বেশ কঠিন ব্যাপার! টেকনিকালি বললে, বলতে হয়, AI এই হাজার হাজার মাত্রার ভেক্টর স্পেস-এ ‘ভাবে’! ভেক্টর হলো এমন কিছু বস্তু যার অনেক কম্পোনেন্ট আছে, একের বেশি সংখ্যা দিয়ে তাকে লেখা যায়।

 

আসলে, আমাদের ভাষা যখন AI পড়ছে, তখন (এলগোরিদম-এর সাহায্যে) ভাষার শব্দ ও সিনট্যাক্সগুলো কে নাম্বার টোকেন দিয়ে আইডেন্টিফাই করে তারপর লম্বা লম্বা ভেক্টরে এনকোড করা হয়। AI এইসব ভেক্টরগুলোকে অসংখ্য মাত্রার স্পেসে দ্যাখে। সেখানে ভেক্টরগুলোর মধ্যে সম্পর্ক দ্যাখে, দূরত্ব খোঁজে। সবটাই অঙ্ক! ধরা যাক, গণতন্ত্র, লাল নীল রঙ, বৃষ্টির গন্ধ অথবা যুদ্ধ বা ভালোবাসা – সবই ভেক্টর। বহুমাত্রিক ভেক্টর স্পেসে এদের মধ্যে দূরত্ব কষা হয়। এদের ভিতরে অঙ্ক করা হয়! পিছনের অঙ্কটা কঠিন নয় কিন্তু বহুমাত্রিক স্পেসে তাদের অবস্থান আর তাদের মধ্যে দূরত্ব বা তাদের ভিতর অঙ্কের সম্পর্ক ভাবা আমাদের পক্ষে বেশ কঠিন ব্যাপার!

 

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − 4 =