AI এসে গেছে (পর্ব ১)

AI এসে গেছে (পর্ব ১)

অভিজিৎ কর গুপ্ত
পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক, পাঁশকুড়া বনমালী কলেজ (অটোনমাস)
Posted on ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

AI এসে গেছে! AI থাকবে। AI প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকবে। AI যে আমাদের জীবন ও মননে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে শুরু করেছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই।

প্রশ্ন হলো, এই AI কি ভয় পাবার মতো কিছু টেকনোলজি? তা কি আমাদের মনোজগৎকে পুরো গ্রাস করে ফেলবে নাকি তা আমাদেরকে অভূতপূর্ব উপায়ে ক্ষমতায়ন (empower) করবে? কথা হলো, আমরা কী আশা করব? AI কি আমাদের জন্য ভাববে নাকি সে আমাদের সাথে ভাববে? তা কি আমাদের ভাবনার সহযোগী হয়ে উঠবে? AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের বর্ধিত বুদ্ধিমত্তা (augmented intelligence) হয়ে উঠবে? তথ্যের পাহাড় আর পরিসংখ্যানের একগেয়েমি থেকে কি সে আমাদেরকে মুক্ত করে প্রকৃত মানবিক নৈপুণ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করবে?

ধরা যাক, AI আমাদের আশি শতাংশ কাজ এক মুহুর্তে করে দিচ্ছে। তাহলে আমাদের করার মতো কাজ কী থাকবে? এই যে কাজের বোঝা থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি তাতে কি সেই মুক্ত সময়ে আমাদের উৎসুক মন সম্পূর্ণ নতুন কোন দিকে সঞ্চালিত হতে পারে?

এইসমস্ত প্রশ্ন এখন খুবই জরুরি।

একটু ভাবা যাক, জ্ঞানচর্চার জগতে AI কী করতে শুরু করেছে। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সঞ্চিত জ্ঞান আর একেকটি বিষয়ে আমাদের দক্ষতা এসব এখন আর শুধুই বিশেষভাবে পারদর্শী মানুষদের আয়ত্বে থাকছে না, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ঘেরাটোপেও আটকে থাকছে না। যে কোন শিক্ষার্থী অথবা প্রত্যন্ত জায়গার কোন মানুষও এখন তার নাগাল পেতে পারে সহজেই। সুতরাং, বলা যেতে পারে, শিক্ষার যেন একরকম গণতন্ত্রীকরণ হয়ে চলেছে। AI যে শুধু তথাকথিত মেধাবীদেরই এগিয়ে দিতে পারে তা তো নয়, সমস্ত উৎসুক মানুষকেই সাধারণভাবে একটা শক্ত জমির উপর দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে। কাজেই বলা যায়, যেন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ন্যায়বিচারের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে আমাদের জন্য।

AI যখন অসম্ভব পারদর্শিতায় এক নিমেষে কত কী করে ফেলছে, এই বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারকে মুহুর্তে আমাদের সামনে নিয়ে এসে হাজির করছে সেই অবস্থায় আমাদের ভূমিকা কী হবে? হয়ত আমাদের প্রশ্ন করার দক্ষতা, যুক্তিপূর্ণ ভাবনা (critical thinking) বা বিচক্ষণতাই হয়ে উঠবে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

মনে রাখতে হবে, মানুষের মতো AI-এর কোন অভিপ্রায় নেই, কোন অনুভব নেই অথবা মানুষের মতো তার সারা জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতাও নেই। তবে, AI মানুষের ভাষা বুঝতে পারদর্শী হয়ে উঠছে (Natural Language processing)। খুব সুন্দর করে লিখে ফেলছে গল্প, কবিতা বা কোন টেক্সট অথবা পিএইচডি থিসিস। কোন বেদনা অথবা বিশেষ আনন্দের অভিব্যক্তিও প্রকাশ করতে পারছে তার ভাষার ব্যবহার দিয়ে, ঠিক যেমন আমরা করে থাকি। কিন্তু, এসবই তো হচ্ছে অঙ্কের ব্যবহার-এর মাধ্যমে। আমরা এ আই অ্যাপ-এ যা প্রম্পট লিখছি তা থেকে ছবি, টেক্সট ইত্যাদি জেনারেট করার জন্য এ আই চালিত হচ্ছে কোন একটা দিকে।

হয়ত এ আই দিয়ে একটা কিছু সৃষ্টি হলো। তারপর তার ভিতরে মানবিক বোধ চালিত করে তাকে পরিশীলিত করাটাই হবে আমাদের কাজ। কেননা আমাদের ভূমিকা এবং দায়িত্ব পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। ধরা যাক কোন টেক্সট এ আই লিখলো। আমরা হয়ত নিজেরা না লিখে সেই লেখা পরিচালনা করব, লেখা এডিট করব, কিউরেট করব।

AI-এর বৈপ্লবিক উত্থানের এই সময়ে মানুষ হিসাবে আমাদের আবেগ, অনুভূতি, আমাদের বেঁচে থাকার এলিমেন্টগুলোকে বিশেষভাবে রক্ষা করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ। আর, এ আই-এর সৃষ্টির ফসলের মধ্যে সেইসব মানবিক বিষয় সঞ্চালিত করার প্রচেষ্টাতেই মেতে উঠবে আমাদের জীবন। Empathy and Survival!

এই সময়ে, AI কী করতে পারে আর কী পারে না সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা ক্রমশঃই স্পষ্ট হচ্ছে। কোন একটা নতুন টেকনোলজির ক্রমাগত ব্যবহার ও তার সাথে সংযোগের মধ্যে দিয়ে তা হয়ে থাকে।

একটু আলোচনা করে নিই, AI আমাদের জন্য কী কী অপরাজেয় গ্লোবাল সমস্যার সমাধান ইতিমধ্যেই করে ফেলেছে। প্রোটিন ফোল্ডিং-এর সমাধান একটা অসাধ্য সাধন কাজ। ড্রাগ ডিজাইন থেকে শুরু করে বায়োলজিক্যাল সিস্টেম বোঝা এখন অন্য লেভেলে পৌঁছে গেছে! ক্লাইমেট ক্রাইসিস-এর ভবিষ্যদ্বাণী করে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো অবশ্যই একটা মারাত্মক কাজ। পৃথিবীর বিরলতম কিছু ভাষার মানে উদ্ধার করে আমাদের এই মনুষ্যপ্রজাতির ইতিহাস কে জীবন্ত করে তুলেছে AI! তবে, বুঝতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বুদ্ধিমত্তা আসলে আমাদের এই মানবজাতির সমষ্টিগত জ্ঞানেরই প্রতিফলন, তারই উওরাধিকার যেন সে বহন করে চলেছে।

আচ্ছা, যদি জিজ্ঞাসা করা হয় বুদ্ধি কী? এক কথায় জবাব দেওয়া বেশ সমস্যার। তবে, ইনফরমেশন সংগ্রহ করা, তাকে প্রসেস করা, তা থেকে শেখা আর তা কাজে লাগানো। এ তো বুদ্ধিমত্তারই কাজ। মেশিন যদি এসব করতে পারে তবে তারও বুদ্ধি আছে ধরে নিতে পারি আমরা।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + 11 =