গ্রিনল্যান্ডের রূপ বদল

গ্রিনল্যান্ডের রূপ বদল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ জুলাই, ২০২৬

পৃথিবীর উষ্ণায়নের প্রভাব যে শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়, তার নতুন প্রমাণ মিলল বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, দ্রুত হারে বরফ গলার ফলে গ্রিনল্যান্ড কেবল তার বরফস্তর হারাচ্ছে না, সেই সঙ্গে দ্বীপটির ভৌত আকৃতিও বদলে যাচ্ছে। কোথাও ভূমি ফুলে উঠছে, কোথাও সংকুচিত হচ্ছে, এমনকি পুরো দ্বীপটিই ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে।

২০২৫ সালে Journal of Geophysical Research: Solid Earth-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রিনল্যান্ড এখন এক ধরনের ভূতাত্ত্বিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সুমেরু অঞ্চলের মানচিত্র, নৌপথ এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে প্রভাবিত করতে পারে।

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা গ্রিনল্যান্ডের ৫৮টি স্থানে বসানো জিপিএস স্টেশন থেকে প্রায় ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, পুরো দ্বীপটি গড়ে প্রতি বছর প্রায় ২ সেন্টিমিটার হারে উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে।

দৈনন্দিন জীবনের তুলনায় এই গতি খুবই সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু ভূতত্ত্বের পরিমাপে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পৃথিবীর কঠিন ভূত্বকও আসলে স্থির নয়; তাও বরফ, জল এবং অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক শক্তির প্রভাবে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।

হাজার হাজার বছর ধরে গ্রিনল্যান্ডের ওপর জমে থাকা বিশাল বরফস্তর পৃথিবীর ভূত্বকের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই বরফ দ্রুত গলছে। কোটি কোটি টন বরফ হারিয়ে গেলে ভূত্বকের ওপরের চাপও কমে যায়। এর ফলে ভূমি ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করে। যেমন দীর্ঘদিন চেপে রাখা একটি স্পঞ্জ হঠাৎ চাপমুক্ত হয়ে আবার ফুলে ওঠে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বরফ ক্ষয়ের কারণে গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন অংশ শুধু উঁচুই হচ্ছে না, বরং চারদিকে সামান্য প্রসারিতও হচ্ছে। অর্থাৎ দ্বীপটির ভৌত আকার বাস্তব অর্থেই বদলে যাচ্ছে।

তবে গ্রিনল্যান্ডের পরিবর্তনের পেছনে শুধু বর্তমানের জলবায়ু সংকটই দায়ী নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শেষ হিমযুগের উত্তরাধিকারও এখনও কাজ করে চলেছে।

প্রায় ১১,৭০০ বছর আগে পৃথিবীর শেষ মহা-হিমযুগের অবসান ঘটেছিল। সেই সময়ে গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর গোলার্ধের বহু অঞ্চল কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফস্তরের নীচে চাপা ছিল। বরফ গলে যাওয়ার পর ভূমি ধীরে ধীরে তার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করে। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়াকে বলা হয় হিমবাহের সমস্থিতিক সামঞ্জস্য।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, হাজার হাজার বছর পরও সেই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এখনও চলছে। ফলে গ্রিনল্যান্ডের কিছু অঞ্চল বর্তমানে প্রসারিত হলেও অন্য কিছু অঞ্চল সংকুচিত হচ্ছে। আধুনিক বরফ গলা এবং প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া—এই দুই শক্তি মিলেই দ্বীপটির বর্তমান রূপ গঠন করছে।

গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যবেক্ষণ হলো, সাম্প্রতিক বরফ ক্ষয়ের কারণে গ্রিনল্যান্ডের কিছু অংশের আয়তন সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা যে মানচিত্রে দ্বীপটিকে দেখি, বাস্তবে তার আকৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের বাস্তব গুরুত্বও কম নয়। সুমেরু অঞ্চলে নৌপরিবহন, উপগ্রহ ভিত্তিক ন্যাভিগেশন, অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক জরিপের ক্ষেত্রে ভূমির অবস্থান ও উচ্চতার সূক্ষ্ম পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে সমুদ্রের বরফ দ্রুত কমে যাওয়ায় সুমেরু অঞ্চল এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতি বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ডের চলমান ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অপরিহার্য।

গ্রিনল্যান্ডের এই ধীর অবিরাম রূপান্তর দেখে বোঝা যায় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পৃথিবীর প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। শুধু হিমবাহ নয়, বদলে যাচ্ছে ভূখণ্ডের আকৃতি, ভূমির উচ্চতা এবং এমনকি পুরো দ্বীপের অবস্থানও।

বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের প্রতিটি মিলিমিটার ভূমি-উত্থান, প্রতিটি সেন্টিমিটার স্থানচ্যুতি আমাদের জানান দিচ্ছে—উষ্ণায়নের প্রভাব কেবল বায়ুমণ্ডলে নয়, পৃথিবীর কঠিন ভূত্বকের গভীরেও অনুভূত হচ্ছে।

আর সেই কারণেই গ্রিনল্যান্ডকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য অপরিহার্য।

 

 

সূত্র: Study published in the Journal of Geophysical Research: Solid Earth (2025)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + 4 =