বিশ্ব উষ্ণায়ন ও ধান চাষের সংকট 

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও ধান চাষের সংকট 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ জুলাই, ২০২৬

সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, পৃথিবীর অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য ধান (চাল) বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের কারণে তার প্রাকৃতিক তাপসহনশীলতার সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমান হারে জলবায়ু পরিবর্তন চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল চাষের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে কয়েকশ কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক বিপদের মুখে পড়বে।

ফ্লোরিডা মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য, উপগ্রহচিত্র এবং আধুনিক জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে গত প্রায় ৯ হাজার বছরে ধান চাষের বিস্তার ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে ধান চাষ নির্দিষ্ট তাপমাত্রার সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বর্তমানে বিশ্ব উষ্ণায়ন এত দ্রুত ঘটছে যে ধানের স্বাভাবিক অভিযোজন ক্ষমতা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ধান সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়ায় ভালো জন্মালেও গড় তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯১°F) অতিক্রম করলে গাছে তাপজনিত চাপ বা হিট স্ট্রেস দেখা দিতে শুরু করে। আর প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪°F)-এর কাছাকাছি পৌঁছালে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইতিহাসে এমন কোনো অঞ্চলে সফলভাবে ধান চাষের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যেখানে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮২°F)-এর বেশি ছিল।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু প্রধান ধান উৎপাদনকারী এলাকা এই তাপমাত্রার সীমা অতিক্রম করতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম ধান উৎপাদক দেশ ভারত উল্লেখযোগ্য উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, কৃষকের আয় হ্রাস এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হতে পারে।

গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক নিকোলা গথিয়ে জানান, জিনগত উন্নয়ন, আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তি এবং তাপসহনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে কিছুটা সমাধান সম্ভব হলেও, এসব প্রযুক্তির সুবিধা সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাবে না। বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র কৃষকেরা এই প্রযুক্তি গ্রহণে নানা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বাধার মুখোমুখি হতে পারেন।

আরও দেখা গেছে যে, অতীতে ধান অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশে অভিযোজিত হতে পেরেছিল। কিন্তু আরও বেশি তাপ সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করা জীববৈজ্ঞানিকভাবে অনেক কঠিন। কারণ চরম তাপমাত্রায় ধানের সালোকসংশ্লেষ, ফুল ফোটা এবং শস্যগঠন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানো না গেলে আগামী প্রায় ৫০ বছরের মধ্যেই ধান উৎপাদন ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যকে ঘিরে এক বিশালাকারের খাদ্যনিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

সূত্র: Gauthier, N. et al., Projected warming will exceed the long-term thermal limits of rice cultivation, Communications Earth & Environment (2026).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − three =