মানবদেহ নিখুঁত নয় 

মানবদেহ নিখুঁত নয় 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ মে, ২০২৬

মানুষের শরীরকে আমরা প্রকৃতির এক নিপুণ প্রকৌশল বলে ভাবি। হৃদযন্ত্রের বিরামহীন কাজ থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের জটিলতা কিংবা চোখের বিস্ময়কর ক্ষমতা দেখে মনে হয় যেন সবকিছু অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবতা এতো সরলরৈখিক নয়। মানুষের শরীর আসলে প্রকৃতির বানানো এক নিখুঁত নকশা নয়; এটি কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের পথে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ আপস ও অভিযোজনের গল্প।

বিবর্তন তো আর শূন্য থেকে শরীরের নতুন গঠন তৈরি করে না। বরং পুরোনো গঠনকেই ধীরে ধীরে বদলে নতুন কাজে ব্যবহার করে। আর সেই কারণেই আমাদের শরীরের অনেক অঙ্গ একদা অসাধারণভাবে কার্যকর হলেও আজ নানা সমস্যার উৎস হয়ে দাঁড়ায়। তাকে আমরা নিষ্ক্রিয় অঙ্গ বলে থাকি। মানব শরীরের বেশ কিছু নিষ্ক্রিয় অঙ্গের মধ্যে একটি হল অ্যাপেন্ডিক্স। কার্যকারিতার দিক থেকে এসব অঙ্গের কোনো কাজ নেই, কিন্তু নাস্তানাবুদ করতে ওস্তাদ।

তবে বিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ণ দেখা যায় মানুষের মেরুদণ্ডে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা আগে চারপেয়ে ছিল। তখন মেরুদণ্ডের কাজ ছিল শরীরকে নমনীয় রাখা ও স্নায়ুকে সুরক্ষা দেওয়া। পরে মানুষ দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটা শুরু করলে আবার এই মেরুদণ্ডকেই পুরো শরীরের ওজন বহন করতে হল। ফলে কোমর ব্যথা, ডিস্কের সমস্যা ও মেরুদণ্ডের ক্ষয় আজকাল খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। তাই বলে এরকম ভাবার কারণ নেই যে, মেরুদণ্ড ভুলভাবে তৈরি হয়েছে। বরং সম্ভবত এটি এমন একটি কাজের দায়িত্ব পালন করছে, যার জন্য হয়তো এটি মূলত তৈরিই হয়নি।

আবার আমাদের গলার একটি স্নায়ুও বিবর্তনের অদ্ভুত এক দৃষ্টান্ত। “রেকারেন্ট ল্যারিঞ্জিয়াল নার্ভ’’ সরাসরি গলায় না গিয়ে বুকের ভেতর নেমে আবার ওপরে উঠে আসে। এই অপ্রয়োজনীয় ঘুরপথ আসলে মাছের মতো প্রাচীন পূর্বপুরুষদের শরীরের গঠনের উত্তরাধিকার। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় এই স্নায়ু সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আবার সেদিক থেকে দেখতে গেলে, আমাদের চোখও কিন্তু পুরোপুরি নিখুঁত নয়। চোখের রেটিনায় আলো পৌঁছানোর আগে স্নায়ুর স্তর পার হতে হয়। আবার অপটিক নার্ভ বের হওয়ার জায়গায় একটি “ব্লাইন্ড স্পট’’ বা অন্ধ বিন্দু তৈরি হয়, যেখানে আমরা দেখতে পাই না। মস্তিষ্ক সেই ফাঁক পূরণ করে দেয় বলে আমরা তা বুঝতে পারি না।

আবার, দাঁতের ক্ষেত্রেও আরেকরকম সমস্যা দেখা যায়। মানুষের মাত্র দুই প্রস্থ দাঁত হয়, দুধের দাঁত ও স্থায়ী দাঁত। একবার স্থায়ী দাঁত নষ্ট হলে নতুন দাঁত আর গজায় না। এছাড়া আক্কেল দাঁত এখন অনেক মানুষের চোয়ালে ঠিকমতো জায়গা পায় না, কারণ আমাদের খাদ্যাভ্যাস বদলালেও বা চোয়াল ছোটো হলেও দাঁতের সংখ্যা আগের মতোই রয়ে গেছে।

সবচেয়ে বড় বিবর্তনীয় আপস দেখা যায় সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে। সোজা হয়ে হাঁটার জন্য মানুষের পেলভিস সরু হয়েছে। কিন্তু একটা মানব শিশুর মাথা তুলনামূলকভাবে বড়। ফলে প্রসব প্রক্রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তা অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি জটিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা যাকে শরীরের নিখুঁত নকশা ভেবে প্রকৃতিকে বাহবা দিচ্ছি , সেক্ষেত্রেও ত্রুটি কিছু না কিছু রয়েই গেছে। আর এই ত্রুটি গুলোই আসলে বিবর্তনের ইতিহাসের অংশ। পিঠব্যথা, সাইনাসের সমস্যা, আক্কেল দাঁত গজানোর যন্ত্রণা কিংবা প্রসবকালীন ঝুঁকি এসব কেবল দুর্ভাগ্যই নয়। এগুলো আমাদের বিবর্তনী অতীতের চিহ্ন, যা আমরা আজও শরীরের ভেতরে বহন করে চলেছি।

 

সূত্র: The Human Body Isn’t Perfect – It Was Improvised by Evolution

By Lucy E. Hyde, University of Bristol 20th May, 2026, Adapted from an article originally published in The Conversation.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + 4 =